#অতৃপ্ত আইডি

profile Ansarul Mullah , 2020 March 03

রাত তখন প্রায় ২ টা। ফেসবুকিং করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম একটা ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসলো। গিয়ে দেখলাম একটা মেয়ের আইডি, আইডির নাম, ‘তামান্না আফরিন’।

আমি প্রোফাইল চেক না করেই রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করে ফেললাম।

রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করার পর আমি মেয়েটির প্রোফাইলে ঢুকলাম, এবং তার ছবিগুলো দেখতে লাগলাম।

মাশাআল্লাহ! এতো সুন্দর মেয়েটা! বলার বাহিরে!

তার আইডিতে তার সাথে অনেকেরই ছবি আছে। এরা হয়তো তার ফ্রেন্ডস আর ফেমিলি মেম্বার। এসব দেখে এতটুকু নিশ্চিত হলাম যে এটা ফেইক আইডি না।

আমি তার ছবিগুলো দেখতে লাগলাম।

.

মিনিট খানিক পর একটা মেসেজ আসলো। ইনবক্সে গিয়ে দেখলাম এই মেয়েটারই মেসেজ।

মেয়েটি “হাই” দিলো।

আমিও রিপ্লাই দিলাম “হেলো”।

মেয়েটি বললো,

~ কেমন আছেন?

.

— জি ভালো। আপনি?

.

~ হ্যা ভালো।

.

— জি, ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দেয়ার কোনো কারণ?

.

~ নাহ, এমনিই দিলাম।

.

— ওহ আচ্ছা।

.

~ আপনাকে ভালো লেগেছে।

.

তার এ কথা শুনে কিছুটা অবাক হলাম। আবার একটু ভালোও লাগলো। কারন ওর ছবিগুলো দেখে ও কে আমার অনেক ভালো লেগেছে।

আমি জবাব দিলাম,

— ইয়ে..মানে, বুঝতে পারলাম না

.

~ বললাম, আপনাকে আমার অনেক ভালো লেগেছে।

.

— ওহ আচ্ছা।

.

~ ফ্রেন্ডশিপ করবেন?

.

— হ্যা, করবো।

.

~ তাহলে আজ থেকে আমরা ফ্রেন্ড।

.

— ঠিকাছে।

তার সাথে ফ্রেন্ডশিপ হলো আমার। সারারাত আরো অনেক কথা বললাম তার সাথে। পরিচিত হলাম অনেকটা।

তার নাম তামান্না। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। মিরা রোডের পাশেই তার বাসা।

আমিও আমার সম্পর্কে সবকিছু বললাম তাকে।

.

এভাবে আমরা কথা বলতে থাকি একে অপরের সাথে। প্রায় তিন মাস হয়ে গেলো আমাদের বন্ধুত্বের। এ তিন মাসেই আমার আলাদা একটা ভালোলাগা কাজ করে তার প্রতি। আর তামান্নাও আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে।

এ তিনমাস আমি তামান্নার সাথে প্রতিদিন চ্যাট করেছি, এবং তামান্না আমাকে সবসময় একটাই কথা বলতো যে,

“কখনো আমাদের চ্যাটের স্ক্রিনশট নিবে না, আর কখনো আমাকে কোনো পোস্টে মেনশন করবা না”।

.

এ কথাটা তামান্না সবসময় খুব জোর দিয়ে এবং সিরিয়াসলি বলতো। যা আমার কিছুটা অদ্ভুদ লাগে যে সে কেনো সবসময় এক কথা বলে।

যাই হোক, আমি এসব মাথায় না নিয়ে তামান্নার কথামতো কখনো আমাদের চ্যাটের স্ক্রিনশট নেই নি, আর কখনো তাকে কোনো পোস্টে মেনশন করিনি।

.

সে সবসময় তার আইডিকে লুকাতে চাইতো, কারণটা আমার জানা নেই।

.

অনেকদিনই হয়ে গেলো আমরা কথা বলছি, কিন্তু বাস্তবে কোনো দেখা নেই।

আমি তামান্নাকে জিজ্ঞেস করলাম, দেখা করবে কি না।

তামান্না প্রথমে না করলেও, পরে রাজি হয়ে যায়। কারন তারও নাকি অনেক ইচ্ছা আমাকে দেখার।

.

তামান্না আমাকে একটা কফি শপের নাম বলে, নামটি হলো ‘ক্যাফেরিনো’।

আমি কফিশপটা না চেনার কারনে তামান্না আমাকে সেই এড্রেস মেসেজে পাঠিয়ে দেই।

সে বললো এই কফিশপে রাত ১১ টার দিকে আসতে।

আমি তামান্নাকে জিজ্ঞেস করলাম,

— এতো রাতে দেখা করবা?

.

~ হ্যা, আম্মু নানুর বাড়িতে গিয়েছে আর আব্বুর নাইট ডিউটি আছে, তাই আমার পক্ষে রাতের বেলায় দেখা করাটাই সম্ভব।

.

তামান্নার যুক্তিটি মানার মতো। তাই আমি এ নিয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। আমি বললাম,

— আচ্ছা ঠিকাছে আজ রাতেই এসো।

.

~ হুম, ঠিকাছে।

.

রাত ১০ টাই আমি বাসা থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। শীতকাল ছিলো, তাই রাস্তাঘাটে মানুষ ছিলো হাতে গুণা কয়েকজন। চারিদিকে ঘন কুয়াশা।

কোনো রিকশা বা বাস নেই। তাই পাঁয়ে হাঠা শুরু করলাম। প্রায় অনেকটা হাঁটার পর একটা রিকশার দেখা মিললো।

রিকশাওয়ালাকে বললাম, মামা সামনে যে ‘ক্যাফেরিনো’ কফিশপ আছে, ওখানে যাবেন?

.

রিকশাওয়ালা প্রায় ১০/১২ সেকেন্ড ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। আর বললো,

~ সত্যি ঐখানেই যাইবেন?

.

— আরে মামা হ্যা, ওখানেই যাবো।

.

সে আবার কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলো, কিছুক্ষণ পরে বললো,

~ আইচ্ছা, চলেন।

.

রিকশায় উঠে রওনা দিলাম ‘ক্যাফেরিনো’র দিকে। বেশ অনেক্ষটা সময় লাগলো পৌঁছাতে।

পৌঁছানোর পর রিকশা থেকে নেমে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিচ্ছিলাম।

রিকশাওয়ালা ভাড়া নিতে নিতে বললো,

~ মামা! সাবধানে থাকবেন।

.

তার এ কথা শুনে কিছুটা খটকা লাগলো।

যাই হোক, আমি হেঁটে হেঁটে চারিদিকে ঘুরতে লাগলাম। কিন্তু ‘ক্যাফেরিনো’ নামের কোনো কফিশপ দেখছিলাম না।

চারিদিকে অন্ধকার, কিছুটা দূরে প্রায় ১২/১৫ টা কুকুর একসাথে ঘেউ ঘেউ করছে।

মোবাইলের লাইট অন করলাম। অন করে উপরে তুলতেই দেখলাম উপরে একটা ভাঙাচোরা বোর্ড, যে বোর্ডের উপর লেখা ‘ক্যাফেরিনো’ কফিশপ।

.

আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। কারন এই কফিশপটা এখন কফিশপের হালে নেই। প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত। আয়না ভাঙা পড়ে আছে চারিদিকে। পোড়া পোড়া সব চেয়ার টেবিল। দেয়ালগুলো ভেঙে গিয়েছে। আর উপরে ভাঙা দেয়ালে একটা বোর্ড আটকে ছিলো, যেখানে লেখা ‘ক্যাফেরিনো’ কফিশপ।

আমি প্রচন্ড ভয় পেলাম! হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো আমার। আমি কোনোমতে মোবাইলটা বের করে ফেসবুকে ঢুকলাম। দেখলাম তামান্না এক্টিভ।

তামান্নাকে মেসেজ দিলাম,

— কই তুমি? কখন আসবে? আর এই জায়গাটা এমন কেনো?

~ এইতো আসছি, দু মিনিট।

.

তামান্নার রিপ্লাই পেয়ে মোবাইলটা আবার পকেটে রেখে দিলাম। স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সেই অন্ধকার জায়গায়। একটু পর অনুভব করলাম গুড়িগুড়ি বৃষ্টির ফোটা আমার মুখে লাগছে আর তীব্র বাতাস শুরু হয়েছে। আমার বুকটা ভয়ে ধকধক করতে লাগলো।

আমি বৃষ্টি হতে বাঁচার জন্য সেই ভাঙাচোরা ‘ক্যাফেরিনো’র ভিতর ঢুকে পড়লাম।

মোটামোটি কিছুটা হলেও বৃষ্টি থেকে বাঁচা যাচ্ছে।

.

সেই ভাঙাচোরা কফিশপের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার ঘাঁড়ে কিছু একটা যেনো বারবার স্পর্শ করছে, অনেকটা মেয়েদের ভেজা চুলের মতো।

এটা অনুভব করার পর আমি আর নাড়াচাড়া করতে পারছিলাম না। পেছনে ফেরার মতো সাহসটুকু আমার হচ্ছিলো না। আমি মুখ খুলে ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়তে চাইলেও আমার মুখ যেনো বরফে জমে গেলো। আমি মনে মনেই “আয়াতুল কুরসি” পড়তে লাগলাম আর আস্তে আস্তে পেছনের দিকে তাকাতে লাগলাম।

পেছনে তাকিয়ে দেখলাম সেই কফিশপের ছাদের সাথে একটা কাটা মাথা ঝুলে আছে। একটা মেয়ের মাথা। যে মাথার চুলগুলো বাতাসে বারবার আমার ঘাঁড়ের সাথে স্পর্শ করছিলো।

আমি প্রচন্ড রকমের ভয় পেলাম, আর বাহিরের দিকে দৌঁড় দিতে চাইলাম। কিন্তু আমি কোনোমতে সেই কফিশপ হতে বাহির হতে পারছিলাম না। আমি যতই দৌঁড়ে বাহিরের দিকে যেতে চাচ্ছিলাম, আবার কে যেনো আমাকে বাহির থেকে ধরে এনে ভিতরে আছড়ে ফেলছিলো।

খুব জোড়ে জোড়ে চিৎকার করতে লাগলাম। কিন্তু কেউই আমার আওয়াজ শুনছিলোনা।

.

একটু পর দেখলাম কে যেনো আমার পাশ দিয়ে তীব্র গতিতে চলে গেলো, অনেকটা বাতাসের মতো। আমি ঝপঝপ ঘামছিলাম। ভয়ে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো আমার।

বাহিরে এখনো তীব্র বৃষ্টি হচ্ছে, আর এখানে ভেতরে আমি একলা।

হঠাৎ দেখলাম আমার কাছ থেকে কয়েক ফুট দূরে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির পরণে ছিলো একটা ছেড়া টপস্ এবং গোলাপি রঙের জামা। চেহারা চুলে ঢাকা। মেয়েটির হাত দুটো ঝলসে গিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছিলো আগুনে পোড়ানো হয়েছে তার হাতগুলো।

মেয়েটি আর্তনাদ করে কাঁদছে এবং আমার দিকে তাকিয়ে বলছে, বাঁচাও আমায়, বাঁচাও।

.

আমি এ দৃশ্য দেখে কাঁপতে শুরু করলাম, মনে হচ্ছিলো ভয়ে এক্ষুণি বেরিয়ে আসবে আমার প্রাণ। আর মনে মনে আয়াতুল কুরসি পাঠ করতে লাগলাম। কিন্তু কিছুতেই যেনো কাজ হচ্ছিলো না। মেয়েটির আরো জোরে আর্তনাদ করতে লাগলো, কাকুতিমিনতি করছিলো তার প্রাণ বাঁচানোর জন্য।

এবং আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম সেখানেই। তারপর কি হলো আর কিছু মনে নেই।

.

পরদিন রাতের বেলা জ্ঞান ফিরলো আমার। চোখ খুলে দেখলাম আমি আমার বিছানায়। কয়েকজন লোক নাকি সকালে এনে দিয়ে গিয়েছে আমাকে। তখন থেকেই নাকি আমি অজ্ঞান।

.

আমার হঠাৎ মনে পড়লো কাল রাতের কথা। সাথেসাথেই ঘামতে লাগলাম আমি। আম্মু এক গ্লাস পানি এনে দিলেন, এক শ্বাসে সব পানিই খেয়ে নিলাম।

ঘরের সবাইকে কোনোভাবে মিথ্যা কথা বলে দিলাম, কিন্তু আসলেই কি হয়েছিলো তা কাউকে বললাম না।

.

একটু পর উঠে টেবিলের উপর থেকে মোবাইলটা নিয়ে তামান্নাকে মেসেজ দিলাম,

— কি ফালতু জায়গায় দেখা করতে ডাকলে কাল?

.

~ কেনো? জায়গাটি তো আমার অনেক ভালো লাগে।

.

— আর তুমি আসোনি কেনো কাল??

.

~ এসেছিলাম তো, দেখোনি তুমি?

.

— কি সব আবোলতাবোল বকছো? তুমি তো আসোই নি কাল!

.

~ এসেছিলাম তো। তুমি দেখোনি আমার সেই পোড়া হাত? আমি কত আর্তনাদ করেছি তোমার কাছে, কিন্তু তুমি আমায় বাঁচাও নি।

..

তামান্নার এ রিপ্লাই দেখে আমি সাথে সাথে বিছানায় বসে পড়লাম। দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাটিই মনে হয় হারিয়ে ফেলেছি। কি হচ্ছে কিছু বুঝছিলাম না।

# চলবে_কি ??

..

বিঃদ্রঃ [গল্পটি অনেকটা ছোট গল্পের মতো এবং আগামী পর্বেই এর সমাপ্তি করে দিব ইনশা-আল্লাহ্]

0 Comments , 54 Views